কলকাতা- একসময়ের মেধাবী চিকিৎসক আজ রাস্তার ভবঘুরে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেছেন দীর্ঘদিন। শেষ পর্যন্ত আর পেরে ওঠেননি।
অগোছালো চুল, লম্বা দাড়ি, নোংরা পোশাক ও গন্ধে মানুষজনও তাঁকে এড়িয়ে চলেন। এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দার কাছে তিনি কেবলই একজন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি। কিন্তু হাতে যদি একটি ডায়েরি বা খাতা আর কলম তুলে দেওয়া হয়, মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্য।
তিনি লিখে চলেন ওষুধের নাম, ইনজেকশনের তালিকা। যে কোনও রোগের কথা জিজ্ঞেস করলে একের পর এক ওষুধের নাম লিখে দেন, আর পাতার শেষে ভুল করেন না নিজের ডিগ্রি ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করতে।
তাঁর নাম ডা. সৌরভ ঘোষ। প্রায় দুই দশক আগে তিনি ছিলেন কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (এনআরএস)-এর একজন মেধাবী ছাত্র।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালের আশেপাশে তিনি পড়াশোনা শেষ করেন। শৈশব থেকেই সৌরভ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া সৌরভের বাবা রেলে কর্মরত ছিলেন এবং পাশাপাশি গৃহশিক্ষকতাও করতেন। পরিবারে ছিলেন এক দিদি ও এক ভাই। তাঁরাও পড়াশোনায় কৃতী ছিলেন।
পরিবারের তিন সন্তানের মধ্যেই অল্পবয়স থেকেই মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায় বলে জানান প্রতিবেশীরা। সৌরভের দিদি সাথী ঘোষও চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু পরে মানসিক অসুস্থতায় ভুগে কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। ছোট ভাই গৌরব ঘোষ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হলেও মানসিক অসুস্থতার জেরে তাঁরও অকালমৃত্যু হয়। এর আগেই সৌরভের বাবা-মা প্রয়াত হন।
সৌরভের শৈশবের বন্ধু পৃথ্বীশ চক্রবর্তী জানান, ১৯৯৭ সালে নাকতলা হাই স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর জয়েন্ট এন্ট্রান্সে ভাল র্যাঙ্ক করে সৌরভ এনআরএস মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। প্রতিবেশীদের দাবি, পড়াশোনা শেষ করে তিনি একজন সফল হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর মধ্যে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়। তার পর ধীরে ধীরে হয়ে যান রাস্তার ভবঘুরে।
বর্তমানে সৌরভ থাকেন নিজের বাড়ির প্রথম তলার এক কোণে, একটি নোংরা ঘরে। প্রতিবেশীরা জানান, হাতে কলম পেলেই তিনি বিভিন্ন কথা লিখতে থাকেন। তাঁর বাড়ির দেওয়ালে কোথাও লেখা ‘NRS Medical College’, কোথাও ‘CMC Vellore’, আবার কোথাও ‘KPC Medical College’।
এলাকার কয়েকজন প্রতিবেশী সৌরভের তিন বেলার খাবারের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, অতীতে বহুবার চিকিৎসার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তাতে কোনও স্থায়ী ফল মেলেনি।
