ত্বকের রোগ সারাতে শুরু হয়েছিল দোল খেলা! প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্য কীভাবে বদলে গেল আনন্দ উৎসবে! জেনে নেওয়া যাক

কলকাতা- বসন্তের রঙিন উৎসব। দোলযাত্রা বা হোলি সারা দেশে জনপ্রিয়। বাঙালির কাছে এই উৎসব রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা কিংবা অশুভ শক্তির বিনাশের কাহিনি। ভারতের অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ওড়িশা এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে দোলযাত্রার সূচনার পেছনে কেবল ধর্মীয় কারণই নয়, বরং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ ও বৈজ্ঞানিক ইতিহাস লুকিয়ে।

প্রাচীনকালে মূলত চর্মরোগ প্রতিরোধ এবং বসন্তকালীন শারীরিক অসুস্থতা সারানোর উদ্দেশ্যেই ভেষজ ‘ফাগু’ বা আবির খেলার প্রচলন হয়েছিল।

ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী উৎসবের তালিকায় দোল বা ‘ফাগু দশমী’ এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। সেই সময় আবির তৈরি হত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভেষজ উপাদান দিয়ে।

গবেষকদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে চর্মরোগের প্রকোপ কমাতে এই ভেষজ গুলাল বা ফাগু ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়।

বসন্তকাল হল শীত ও গ্রীষ্মের মিলনস্থল। এই সময়ে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে, যা মানবদেহে ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাসের সংক্রমণের আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।

জলবসন্ত, হাম এবং বিভিন্ন ধরণের চর্মরোগ এই সময়ে মারাত্মক আকার ধারণ করত। ওড়িশার প্রাচীন চিকিৎসকরা লক্ষ্য করেছিলেন, নির্দিষ্ট কিছু ভেষজ উপাদান শরীরের সংস্পর্শে এলে ত্বকের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

প্রাচীন ওড়িশায় দোলযাত্রার আবির বা ফাগু তৈরি হতো মূলত নিচের উপাদানগুলো দিয়ে:

  • পলাশ ও শিমুল ফুল: লাল ও গেরুয়া রঙের জন্য এই ফুলের পাপড়ি শুকিয়ে গুঁড়ো করা হতো। পলাশ ফুলের রস ত্বকের ক্ষত সারাতে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অত্যন্ত কার্যকর।
  • হলুদ ও নিমের গুঁড়ো: অ্যান্টি-সেপটিক হিসেবে হলুদের ব্যবহার সর্বজনবিদিত। নিমের পাতা শুকিয়ে তৈরি করা সবুজ ফাগু ত্বকের চুলকানি ও বসন্তের দাগ দূর করতে ব্যবহৃত হতো।
  • চন্দন ও বেল পাতা: শরীরকে শীতল রাখতে এবং ত্বকের জ্বালা কমাতে চন্দন ও বেলের নির্যাস মেশানো হতো।

ওড়িশায় ভগবান জগন্নাথের দোল উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ভেষজ রঙের ব্যবহার। মন্দিরে দেবতাকে ফাগু অর্পণের পর সেই প্রসাদী আবির ভক্তরা একে অপরের গায়ে মাখতেন। মনে করা হতো, এই পবিত্র ফাগু শরীরে মাখলে সারা বছর কোনো চর্মরোগ হবে না।

কালের নিয়মে এই ভেষজ চিকিৎসাপদ্ধতিটি সামাজিক মেলামেশার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। মানুষ যখন একে অপরকে ভেষজ রঙে রাঙিয়ে দিতে শুরু করল, তখন তার মধ্যে তৈরি হলো ভ্রাতৃত্ব ও আনন্দের পরিবেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *