কলকাতা- তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি। বর্তমানে নিজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তিনি। তাঁর চিরশত্রু ইজরায়েল ইরানের আকাশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। একের পর এক সেনা প্রধানকে মেরে চলেছে ইজরায়েল। এই আবহে নিজে বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
৮৬ বছর বয়সি এই নেতা অবশ্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ইরানি জাতি আত্মসমর্পণের পাত্র নয়’। এবং তিনি পালটা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই সংঘাতে হস্তক্ষেপ করে তাহলে তাদের ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হবে। ১৯৮৯ থেকে ক্ষমতায় থাকা খামেনি তিলে তিলে ইরানের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে। হিজবুল্লা, হুজি থেকে হামাস, সবাইকে মদত দেয় ইরান। ইরাকেও ইরানপন্থী রাজনৈতিক দল রয়েছে। এই গোটা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন খামেনি।
ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে বর্তমান রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন খামেনি। তিনি ‘মোল্লা’ বা শিয়া মুসলিম আলেমদের শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন সেই দেশে। এই আবহে কট্টরপন্থীদের কাছে তিনি নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত ভাবে নিশ্চিত করেছিলেন। ইরানিদের চোখে খামেনি ঈশ্বরের একধাপ নীচে। এই খামেনি নিজের শাসনকালে ইরানের আধাসামরিক বিপ্লবী গার্ডকে এত প্রভাবশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।
খামেনির তৈরি বিপ্লবী গার্ড ইরানের সবচেয়ে অভিজাত সামরিক বাহিনী। দেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির তত্ত্বাবধান করে তারাই। এর আন্তর্জাতিক শাখা কুদস ফোর্স ইয়েমেন থেকে লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত ইরানপন্থী প্রক্সিগুলির সাথে মিলে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ তৈরি করেছে। বছরের পর বছর ধরে ইরানকে এই অঞ্চলে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে এই অক্ষ।
এদিকে খামেনির শাসনকালে ২০০৯ সালে ভোট কারচুপির অভিযোগে দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞার চাপে ২০১৭ ও ২০১৯ সালে অর্থনৈতিক বিক্ষোভও হয়েছিল। বাধ্যতামূলক হিজাব সঠিকভাবে না পরার কারণে পুলিশ মাহসা আমিনির খুন করেছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০২২ সালে দেশব্যাপী আরও বিক্ষোভ হয়েছিল। কারাগারে বন্দিদের নির্যাতন বা ধর্ষণের খবরের মধ্যে বিক্ষোভকারীদের দমন করেছিল খামেনির বিপ্লবী গার্ড। সেই সব অভিযানে শত শত লোক নিহত হয়েছে।
তিন দশকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের প্রভাব বিস্তার করেছেন খামেনি। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল এই অঞ্চলে। কারণ ইরান ঘনিষ্ঠ শিয়া রাজনীতিবিদ এবং মিলিশিয়ারা ইরাকের ক্ষমতায় আসে এরপর। সিরিয়াতে বাশার আসাদ, লেবাননে হিজবুল্লাহ, প্যালেস্তাইনে হামাস এবং ইয়েমেনের হুদি বিদ্রোহীদের একত্রিত করে ইরান প্রতিরোধ অক্ষ তৈরি করেছিল মধ্যপ্রাচ্যে।
তবে গত দুই বছরে এই সমীকরণকে কাজে লাগিয়েও ইজরায়েলকে দমাতে পারেনি ইরান। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইজরায়েলে হামলার পরে শুরু হয়েছিল গাজা উপত্যকার যুদ্ধ। সেখানে হামাসের শীর্ষ নেতৃত্ব খতম হয়েছে। এদিকে হুদি এবং হিজবুল্লাও সেভাবে ইজরায়েলের ক্ষতি করতে পারেনি। বরং ইজরায়েল পালটা তাদের মার দিয়েছে। সব মিলিয়ে খামেনির তৈরি করা ইরানি প্রতিরোধ অক্ষ ভেঙে পড়ছে।
