কলকাতা- নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর নারায়ণহিতি রাজপ্রাসাদে রাজপরিবারের সদস্যরা নৈশভোজ সারতেন একসঙ্গে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে সেই রাতে নৈশভোজের সময়ই অতর্কিতে শুরু হয় গুলি ছোড়া। নিহত হন নেপালের রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেব, রানি ঐশ্বরিয়া রাজ্য লক্ষ্মী দেবীসহ রাজপরিবারের ৯ সদস্য।
এলোপাথাড়ি গুলিতে নিহত অন্যরা হলেন বীরেন্দ্রর ছেলে নিরাজন, মেয়ে শ্রুতি, ভাই ধীরেন্দ্র, বোন শান্তি ও শারদা, শারদার স্বামী কুমার খড়গা ও বীরেন্দ্রর আত্মীয় জয়ন্তী। বীরেন্দ্রর বড় ছেলে যুবরাজ দীপেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেবের গুলিতে রাজপরিবারের এই সদস্যরা নিহত হন। পরে দীপেন্দ্র নিজেই নিজেকে গুলি করেন বলে বলা হয়। গুলিতে আহত হয়ে তিনি কোমায় চলে যান।
বাবার মৃত্যুর পর কোমায় থাকা দীপেন্দ্রকে নেপালের রাজা ঘোষণা করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর তিনি হাসপাতালে মারা যান। নিয়ম অনুযায়ী, নেপালের রাজা হন তাঁর কাকা জ্ঞানেন্দ্র (বীরেন্দ্রর ভাই)। বলতে গেলে এক রাতে নেপালের পুরো রাজপরিবার শেষ হয়ে যায়। হিমালয়–কন্যা হিসেবে পরিচিত নেপালের রাজপরিবারে এই রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি ঘটে আজ থেকে ২৪ বছর আগে, ২০০১ সালের ১ জুন।
বীরেন্দ্রর জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর। কাঠমান্ডুর এই রাজপ্রাসাদেই জন্ম নেন তিনি। তাঁরা বাবা রাজা মহেন্দ্র। ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী ইটন কলেজে পড়েছেন বীরেন্দ্র। পড়েছেন জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঐশ্বরিয়াকে বিয়ে করেন বীরেন্দ্র। দম্পতির প্রথম ছেলে দীপেন্দ্র। তাঁর জন্ম ১৯৭১ সালে।
বাবার মতো দীপেন্দ্রও পড়েছেন ইটন কলেজে। তিনি নেপালের মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন। রয়্যাল নেপালিজ গুর্খা আর্মির একাডেমি থেকে নিয়েছিলেন সামরিক প্রশিক্ষণ। পরে বীরেন্দ্র-ঐশ্বরিয়ার আরও দুই সন্তান হয়। মেয়ে শ্রুতি, জন্ম ১৯৭৬ সালে। ছেলে নিরাজনের জন্ম ১৯৭৮ সালে। রাজা মহেন্দ্রর মৃত্যুর পর ১৯৭২ সালে নেপালের সিংহাসনে বসেন বীরেন্দ্র। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ণ রাজা হিসেবে নেপাল শাসন করেন। ১৯৯০ সালে দেশটিতে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়। নতুন এই ব্যবস্থায় রাজার পদ হয়ে পড়ে পুরোপুরি সাংবিধানিক।
নেপালের রাজপরিবারে সংঘটিত এই হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যের কারণ নিয়ে নানা ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ ছড়ায়। বহুল চর্চিত ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি’ হচ্ছে দীপেন্দ্রর প্রেম-ভালোবাসা-বিয়েঘটিত। ইটন কলেজে পড়ার সময় দীপেন্দ্রর সঙ্গে দেবযানীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই সময় দেবযানীও সেখানে পড়ছিলেন। দেবযানী নেপালের একসময়ের সাবেক শাসক জঙ্গ বাহাদুর রানা পরিবারের মেয়ে। তাঁর বাবা পশুপতি রানা। তিনি নেপালের একজন নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ। মন্ত্রীও ছিলেন। দেবযানীর মা ঊষা রাজে সিন্ধিয়া। তিনি ভারতের সিন্ধিয়া রাজপরিবারের মেয়ে।
বলা হয়ে থাকে, দীপেন্দ্র-দেবযানীর সম্পর্ক মানতে চাইছিলেন না বীরেন্দ্র-ঐশ্বরিয়া। বিশেষ করে ঐশ্বরিয়া তাঁর ছেলের এই সম্পর্ক ভেঙে দিতে অনড় ছিলেন। এই নিয়ে মা–বাবার সঙ্গে দীপেন্দ্রর ঝগড়াবিবাদ পর্যন্ত হয়েছিল।মা–বাবার আপত্তি সত্ত্বেও দীপেন্দ্র তাঁর প্রেমিকা দেবযানীর সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যান। তাঁরা গোপনে পরস্পরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ অব্যাহত রাখেন।
দেবযানীকে বিয়ের পরিকল্পনা করছিলেন দীপেন্দ্র। একপর্যায়ে তিনি মা–বাবার কাছে এই পরিকল্পনার কথা বলেন। এতে ঘোর আপত্তি জানান বীরেন্দ্র-ঐশ্বরিয়া। তাঁরা কোনোমতেই দেবযানীকে রাজবধূ করতে চাইছিলেন না। তাঁরা চেয়েছিলেন, দীপেন্দ্র শাহ পরিবারের ভেতরের কাউকে বিয়ে করুক। দেবযানী ইস্যুতে ২০০১ সাল নাগাদ রাজা-রানির সঙ্গে দীপেন্দ্রর সম্পর্ক চরম তিক্ত পর্যায়ে চলে যায়। বলা হয়, দীপেন্দ্র যদি দেবযানীকে বিয়ের পরিকল্পনায় অনড় থাকেন, তাহলে তাঁকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে বলা হয়েছিল, দেবযানীকে নিয়ে দীপেন্দ্র বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাঁর ছোট ভাইকে ক্রাউন প্রিন্স করা হবে। দেবযানীকে বিয়ে করার বিষয়ে মা–বাবার কাছ থেকে অনুমতি না পাওয়ায় ‘প্রণয়কাতর’ যুবরাজ দীপেন্দ্র রাজ-নৈশভোজের আসরে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলেন।
দীপেন্দ্রকে বিয়ে করার বিষয়টি নিয়ে দেবযানীদের পরিবারেরও ‘দ্বিধাদ্বন্দ্ব’ ছিল বলে বলা হয়। দেবযানী স্থানীয় অভিজাত, ধনি পরিবারের মেয়ে। তিনি বিপুল বিত্তবৈভবের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত দেবযানীর মা এই বিষয়ে মেয়েকে সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন, দীপেন্দ্রর সঙ্গে বিয়ে হলে দেবযানী নেপালের ভবিষ্যৎ রানি হবেন ঠিকই, কিন্তু রানা পরিবারের তুলনায় নেপালি রাজপরিবার ‘গরিব’। দেবযানী বিয়ে করে এমন ঘরে গেলে তিনি টিকতে পারবেন কি না, তা তাঁর গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা দরকার।
ঘটনার এত বছর পরও নেপালের প্রাসাদ-হত্যালীলার নেপথ্যের কারণ অজানা রয়ে গেছে। এই হত্যাযজ্ঞের সাত বছর পর ২০০৮ সালে নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়।
