কলকাতা- আস্ত একটা যুগের অবসান। প্রয়াত প্রখ্যাত বামপন্থী চিন্তাবিদ তথা নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা আজিজুল হক।
দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। সম্প্রতি তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল বিধাননগরের এক বেসরকারি হাসপাতালে। রবিবার থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়।
রক্তে সংক্রমণের মাত্রা বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল। ভেন্টিলেশনের সাপোর্টে রাখতে হয়েছিল। মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ ওই বেসরকারি হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
ষাটের দশক থেকেই অতিবামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন আজিজুল হক। কানু সান্যাল, চারু মজুমদারের মতো বিশিষ্ট নকশালপন্থী নেতাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি। কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
চারু মজুমদারের মৃত্যুর পরে ১৯৭৮ সালে নিশীথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে সিপিআই (এম-এল) দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তাঁদের নেতৃত্বে, সিপিআই (এম-এল) উত্তর ও দক্ষিণ বাংলার কিছু গ্রামীণ এলাকায় এবং বিহারে একটি অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠন করে বলে জানা যায়।
আজিজুল হকের জীবনের একটা বড় সময় কেটেছে কারাগারে। ১৯৭০ সালে পার্বতীপুরম নকশাল ষড়যন্ত্র মামলায় প্রথমবার কারাবন্দি হতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার সকল রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছিল। আজিজুলও মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮২ সালে ফের গ্রেপ্তার হন তিনি।
১৯৮৬ সালে কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর উপর অত্যাচারের রিপোর্ট বেরিয়েছিল সংবাদপত্রগুলিতে। এর পরে বাম সরকারের দুই মন্ত্রী, দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং যতীন চক্রবর্তী তাঁর সঙ্গে জেলে দেখা করেছিলেন। তাঁর অবস্থা দেখে মন্ত্রীরা তাঁর প্যারোলে মুক্তির সুপারিশ করেছিলেন।
তাঁর লেখা ‘কারাগারে ১৮ বছর’ নকশাল আন্দোলন এবং গত শতাব্দীর সাতের দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বলে মনে করা হয়।
জীবনের পরবর্তী সময়ে গোঁড়া নকশাল অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছিলেন আজিজুল হক। যেমন ২০০৬ সালে সিঙ্গুরে বাম সরকারের শিল্পায়নের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিল অধিকাংশ নকশালপন্থী গোষ্ঠী। শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে ছিলেন তাঁরা। অথচ সেই সময়ে এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছিলেন আজিজুল।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসেছিলেন অনেকদিন আগেই। তবে বামপন্থী চেতনাকে আমৃত্যু বহন করেছেন। তিনি বলতেন, স্রোতের বিরুদ্ধে হাঁটাই বামপন্থা।
